কোটা বিরোধীতা দিয়ে শুরু হয়ে আওয়ামীলীগ সরকার পতনে শেষ হওয়া তিনসপ্তাহের আন্দোলনে কখনোই ব্যক্তি শেখ মুজিব বা তাঁর দর্শনের বিরোধিতার কথা শুনা যায়নি। বরং আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্দীপনামুলক বিভিন্ন বক্তব্য ব্যবহার করেছেন। যেমন ‘দাবায়া রাখতে পারবানা’। এমনকি তাঁরা শ্লোগান দিয়েছেন- “বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই”। কিন্তু আন্দোলনে সাফল্যের সাথে সাথেই চিত্র বদলে যায়। সারা দেশে তাঁর ভাস্কর্যগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়, আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘর।
অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী( বর্তমানে উপদেষ্টা) মাহফুজ আলম মুজিববাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। প্রধান উপদেষ্টা যাকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন, সেই মাহফুজ আলম মুজিববাদীদের নির্মুলের কথাও বলেন। অথচ আওয়ামী লীগ তাদের একটা ১৫বছরের শাসনে কখনো মুজিববাদ নিয়ে কিছু বলেনি, দৃশ্যতঃ মুজিববাদের চর্চাও করেনি। আওয়ামী লীগের ৫% নেতা কর্মী মুজিববাদ সম্পর্কে ধারনা রাখে বলেও মনে হয়না। তবু বর্তমান মুজিববাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের যুদ্ধ ঘোষনা, নতুন করে আলোচিত করেছে এই মতবাদকে।
মুজিববাদ কী?- এই প্রশ্নের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুগভীর উত্তর দিয়েছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালে বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও লেখক খন্দকার ইলিয়াস এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে এই প্রশ্ন করেছিলেন। পরে ‘মুজিববাদ’ নামে একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন খন্দকার ইলিয়াস। পড়া যাক মুজিববাদ বিষয়ক সেই প্রশ্ন এবং বঙ্গবন্ধুর ব্যাখ্যা।
প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু, আমরা দীর্ঘকাল আপনার রাজনৈতিক জীবনের সংস্পর্শে থেকে লক্ষ্য করে এসেছি যে, বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহাসিক ধারার বিকাশ ও বাঙালি জাতির চেতনার স্তর বিবেচনায় রেখে আপনি এদেশের রাজনৈতিক, অর্থনেতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্যে সুনির্দিষ্ট ও সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়ে আসছেন, নিজস্ব একটি মতবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। এখন আমার প্রশ্ন আপনি জিন্নাবাদ, গান্ধীবাদ, নাসেরবাদ, ইহুদিবাদ, মাওবাদ, টিটোবাদ, লেনিনবাদ ও মার্কসবাদের আলোকে আপনার মতবাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে কি ভাবছেন?
উত্তর: দেখুন, ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম কতিপয় চিন্তাধারার উপর গড়ে উঠেছে। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তথা সকল মেহনতী মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার চিন্তাধারার মূল বিষয়বস্তু।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। কাজেই কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি জানি শোষণ কাকে বলে। এ দেশে যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে কৃষক, শোষিত হয়েছে শ্রমিক, শোষিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীসহ সকল মেহনতী মানুষ। এ দেশের জমিদার, জোতদার, মহাজন ও তাদের আমলা-টাউটদের চলে শোষণ, শোষণ চলে ফড়িয়া-ব্যবসায়ী ও পুঁজিবাদের। শোষণ চলে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নয়াউপনিবেশবাদের। এ দেশের সোনার মানুষ, এ দেশের মাটির মানুষ শোষণে শোষণে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কি? এই প্রশ্ন আমাকেও দিশেহারা করে ফেলে। পরে আমি পথের সন্ধান পাই।
আমার কোন কোন সহযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল বন্ধুবান্ধব বলেন, শ্রেণী সংগ্রামের কথা। কিন্তু আমি বলি জাতীয়তাবাদের কথা। জিন্নাবাদ এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিষবাষ্প। তার জবাবে আমি বলি, যার যার ধর্ম তার তার- এরই ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা। সেই সঙ্গে বলি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা। শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু রক্তপাত ঘটিয়ে নয়- গণতান্ত্রিক পন্থায়, সংসদীয় বিধিবিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে চাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। আমার এই মতবাদ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিচারবিশ্লেষণ করেই দাঁড় করিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, যুগোশ্লাভিয়া প্রত্যেকে নিজ নিজ পথে, নিজ নিজ অবস্থা মোতাবেক গড়ে তুলছে সমাজতন্ত্র। আমি মনে করি, বাংলাদেশকেও অগ্রসর হতে হবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই চারিটি মূল সূত্র ধরে, বাংলাদেশের নিজস্ব পথ ধরে।
আমার উপরোক্ত মতবাদকে অনেকে বলছেন, ‘মুজিববাদ’। এ দেশের লেখক, সাহিত্যিক কিংবা ঐতিহাসিকগণ আমার চিন্তাধারার কি নামকরণ করবেন সেটা তাদের ব্যাপার, আমার নয়। নামকরণের প্রতি আমার কোন মোহ নেই। আমি চাই কাজ। আমি চাই আমার চিন্তাধারার বাস্তব রূপায়ণ। আমি চাই শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ! আমি চাই আমার স্বপ্ন সোনার বাংলা নির্মাণের পূর্ণ বাস্তবায়ন।
